
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬
ফুটবলপ্রেমীরা, বিশেষ করে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনে দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের ম্যাচটি যারা দেখেছেন, তাদের অনেকের মনেই একটি প্রশ্ন জেগেছে—স্টেডিয়ামে অসংখ্য খালি আসন চোখে পড়লেও মাঠে উপস্থিতির সংখ্যা প্রায় পূর্ণ ধারণক্ষমতার কাছাকাছি কেন দেখানো হলো?
টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় ম্যাচে গুয়াদালাহারা স্টেডিয়ামে আনুষ্ঠানিক দর্শকসংখ্যা ঘোষণা করা হয় ৪৪,৯৮৫। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, এটি স্টেডিয়ামের তালিকাভুক্ত ধারণক্ষমতা ৪৫,৬৬৪ থেকে মাত্র প্রায় ৭০০ কম। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী গ্যালারিতে খালি আসন খুব কম থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে ম্যাচ চলাকালে বিশেষ করে মধ্যমাঠের আশপাশে হাজারো আসন ফাঁকা দেখা যায়।
দক্ষিণ কোরিয়া ২-১ ব্যবধানে চেক প্রজাতন্ত্রকে হারিয়ে গ্রুপ ‘এ’-তে মেক্সিকোর সমান পয়েন্ট অর্জন করলেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দর্শক উপস্থিতির হিসাব। প্রশ্ন উঠেছে, ঘোষিত সংখ্যাটি কি সত্যিই মাঠে উপস্থিত দর্শকের সংখ্যা প্রতিফলিত করে?
ঘোষিত উপস্থিতির সংখ্যা বেশি দেখানোর কারণ কী?
সহজভাবে বলতে গেলে, ফুটবল ক্লাব ও টুর্নামেন্ট আয়োজকেরা সাধারণত মাঠে উপস্থিত দর্শকের সংখ্যা নয়, বরং বিক্রি হওয়া টিকিটের সংখ্যা প্রকাশ করে থাকে।
দেশীয় লিগগুলোর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। অনেক মৌসুমী টিকিটধারী (সিজন টিকিট হোল্ডার) বিভিন্ন ম্যাচে উপস্থিত না থাকলেও তাদের আসন হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে, কারণ টিকিট ইতোমধ্যে বিক্রি হয়েছে।
বড় টুর্নামেন্টগুলোতেও একই পরিস্থিতি দেখা যায়। কারণ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক টিকিট করপোরেট স্পনসরদের জন্য বরাদ্দ থাকে। টেনিসের ফ্রেঞ্চ ওপেনের মতো বড় ক্রীড়া আসরেও টেলিভিশনে দৃশ্যমান সামনের সারির করপোরেট আসনগুলো প্রায়ই খালি বা আংশিক পূর্ণ দেখা যায়, বিশেষ করে টুর্নামেন্টের শুরুর দিকে।
গুয়াদালাহারার ম্যাচে মধ্যমাঠের আশপাশে খালি আসনের ঘনত্বও আংশিকভাবে করপোরেট টিকিটধারীদের অনুপস্থিতির ফল হতে পারে।
বিশ্বকাপে স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা কেন কমে যায়?
ফিফার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে গিয়ে অনেক স্টেডিয়ামে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হয়, যার ফলে আসনসংখ্যা কমে যায়।
বর্তমান বিশ্বকাপের বেশ কয়েকটি ভেন্যু মূলত ফুটবলের জন্য নির্মিত নয়। উদাহরণ হিসেবে সোফাই স্টেডিয়ামের কথা বলা যায়, যা মূলত আমেরিকান ফুটবল খেলার জন্য নির্মিত। আমেরিকান ফুটবল মাঠের প্রস্থ সাধারণত ৫৩.৩ গজ (৪৮.৮ মিটার), যেখানে ফুটবল মাঠের প্রস্থ সাধারণত ৭৫ থেকে ৮০ গজ (৬৮.৫ থেকে ৭৩.২ মিটার) হয়ে থাকে।
ফলে বিশ্বকাপের জন্য মাঠের প্রস্থ বাড়াতে স্টেডিয়ামের কিছু অংশ পুনর্গঠন করতে হয়েছে এবং কিছু আসন অপসারণ করা হয়েছে। গত মৌসুমে এলএ র্যামসের ম্যাচগুলোতে গড়ে ৭৩,৩২৫ দর্শক উপস্থিত থাকলেও বিশ্বকাপে সোফাই স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০,৪৯২।
এছাড়া বিজ্ঞাপন বোর্ড, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাজের স্থান এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তার কারণেও আসনসংখ্যা কমে যায়।
উপস্থিতি ঘোষণা করার ক্ষেত্রে কী নিয়ম অনুসরণ করা হয়?
সংক্ষেপে বলতে গেলে, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, যুক্তরাজ্যের স্পোর্টস গ্রাউন্ড সেফটি অথরিটি কিংবা প্রিমিয়ার লিগের মতো সংগঠনগুলো নিরাপত্তা ও জনসমাগম ব্যবস্থাপনার জন্য ক্লাবগুলোর কাছ থেকে গেট-স্টেটমেন্ট চাইলেও, কোন ধরনের উপস্থিতির পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হবে সে বিষয়ে ক্লাব ও আয়োজকেরা স্বাধীনতা ভোগ করে।
কিছু ক্লাব প্রকৃত উপস্থিত দর্শকের সংখ্যা প্রকাশ করে, আবার অনেক ক্লাব বিক্রি হওয়া টিকিটের সংখ্যাকেই উপস্থিতি হিসেবে তুলে ধরে।
ইংলিশ ফুটবল লিগের (ইএফএল) একটি ক্লাবের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত এক সূত্র, যিনি পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি, জানান যে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংস্থাও অনেক সময় প্রকৃত উপস্থিতির সংখ্যা জানতে চায়। এসব তথ্য স্পনসরশিপ চুক্তি অর্জনে সহায়ক হতে পারে এবং দর্শকসংখ্যা নিয়ে কারসাজির অভিযোগের পেছনেও এটি একটি কারণ হতে পারে।
অর্থাৎ, গুয়াদালাহারা থেকে হাজার মাইল দূরে থাকা কোনো সমর্থক বা টিকিট পুনর্বিক্রেতা যদি টিকিট কিনেও ম্যাচে উপস্থিত না হন, ফিফা সেই টিকিটকে হিসাবের মধ্যে রাখতে পারে।
এ বিষয়ে ফিফার একজন মুখপাত্র বলেন, আনুষ্ঠানিক উপস্থিতির পরিসংখ্যান নির্ধারণ করা হয় স্ক্যান হওয়া টিকিট এবং স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণের ভেতরে উপস্থিত দর্শকের ভিত্তিতে, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে আসনের দৃশ্যমান দখলদারিত্ব দেখে নয়। ফিফা স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ ও টিকিটিং টিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাতে প্রকাশিত সব পরিসংখ্যান যাচাইকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হয়।
তিনি আরও বলেন, গুয়াদালাহারার ম্যাচে অনেক টিকিটধারী দর্শককে পুরো ম্যাচজুড়ে নিজেদের আসনে না বসে কনকোর্স বা চলাচলের এলাকায় অবস্থান করতে দেখা গেছে।
ফিফা কি বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রিতে সমস্যায় পড়ছে?
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ফিফা জানায়, এক মাসব্যাপী আবেদন পর্বে বিশ্বকাপের টিকিট কেনার জন্য ৫০ কোটিরও বেশি আবেদন জমা পড়েছে। পরবর্তীতে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো দাবি করেন, প্রতিটি ম্যাচের টিকিট ইতোমধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে। তবে পরে ফিফা এই বক্তব্য থেকে সরে আসে।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন ম্যাচগুলোর জন্য ফিফা কিছু টিকিট সংরক্ষণ করে রাখে, যা বাজারে কৃত্রিম সংকটের ধারণা তৈরি করতে পারে। কিছু ম্যাচে প্রকৃতপক্ষে বিপুল চাহিদা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মেক্সিকো সিটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মেক্সিকোর ২-০ গোলের জয়ের ম্যাচটি ছিল পুরোপুরি হাউসফুল। শহর ও স্টেডিয়ামের পরিবেশ বিবেচনায় ধারণা করা হয়, আরও দ্বিগুণ দর্শক উপস্থিত করাও সম্ভব ছিল।
তবে সব ম্যাচের ক্ষেত্রে এমন আগ্রহ দেখা যায় না। গুয়াদালাহারায় দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের ম্যাচটির ক্ষেত্রে আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
দ্য অ্যাথলেটিকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত রোববার রাত পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী ম্যাচে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে খেলার জন্য বিভিন্ন পুনর্বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে প্রায় ১০,০০০ টিকিট তালিকাভুক্ত ছিল। এর মধ্যে ফিফার নিজস্ব রিসেল প্ল্যাটফর্মে ছিল ৫,৩১১টি, সিটগিকে প্রায় ৩,০০০টি, টিকিটমাস্টারে প্রায় ২,০০০টি, স্টাবহাবে কয়েকশ এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে আরও কিছু টিকিট বিক্রির জন্য উন্মুক্ত ছিল।
সব মিলিয়ে, বিশ্বকাপের ঘোষিত দর্শকসংখ্যা এবং গ্যালারিতে দৃশ্যমান উপস্থিতির মধ্যে পার্থক্য থাকা অস্বাভাবিক নয়। টিকিট বিক্রি, করপোরেট বরাদ্দ, অনুপস্থিত দর্শক এবং ফিফার গণনার পদ্ধতি—সবকিছু মিলিয়েই এই ব্যবধান তৈরি হয়।
মোবাইল: +৮৮০১৭১১৯৯৭৯৫৭
ইমেইল: sahabibcomilla@gmail.com
24newstv.tv