শ্রীলঙ্কায় সংকুচিত হতে থাকা বনাঞ্চল ও হাতির বাসস্থান ক্ষতির কারণে মানুষ ও হাতির সংঘাত এখন চরম আকার ধারণ করেছে। দ্বীপরাষ্ট্রটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় গালগামুওয়া অঞ্চলে খাদ্যের সন্ধানে বুনো হাতি প্রায়ই লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।
শ্রীলঙ্কানদের সংস্কৃতি ও পর্যটন শিল্পের অন্যতম প্রতীক হলেও এই অঞ্চলে মানুষ ও হাতি উভয়ই এখন প্রাণঘাতী এক সংঘাতের মুখে পড়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে মানুষ-হাতি সংঘাতের দিক থেকে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ স্থান শ্রীলঙ্কা। ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছর এই প্রাণীগুলোর আক্রমণে শ্রীলঙ্কায় গড়ে ১৩৮ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। অন্যদিকে, একই সময়ে খাদ্যের সন্ধানে গ্রামে ঢুকে পড়া হাতির মৃত্যুর গড় সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০২-এ।
২০২৩ সালে রেকর্ড ৪৮৮টি হাতির মৃত্যু হয়। যার পেছনে ছিল গুলি, বিষক্রিয়া, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া বা ট্রেন দুর্ঘটনার মতো কারণ।বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯২০-এর দশকে শ্রীলঙ্কার ৭০ শতাংশ এলাকা বনে ঢাকা থাকলেও তা বর্তমানে কমে ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশটির আনুমানিক ৭,৪৫১টি বন্য হাতির প্রায় ৭০ শতাংশই বাস করে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরে।
বিগত ২০ বছরে গালগামুওয়ার সিয়ামবালাঙ্গামুওয়া জলাধারের চারপাশের জঙ্গল কেটে ফেলার পর থেকেই হাতিগুলো নিয়মিত লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।গালগামুওয়ার গালগামুওয়া অঞ্চলের বাসিন্দা ও বন্যপ্রাণী কর্মকর্তা দেওয়াগিরি মুদিয়ানসেলাগে থিলাকারত্নে বান্দারা এবং তার স্ত্রী গত ডিসেম্বরে বাড়ির উঠোনে ঢুকে পড়া হাতির আক্রমণের শিকার হন। আক্রমণে বান্দারার পা ভেঙে যায় এবং তার স্ত্রীর একটি পা কেটে ফেলতে হয়। বান্দারা জানান, দুই দশক আগে হাতির আনাগোনা বিরল হলেও এখন তা দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাতির আক্রমণ এড়াতে স্থানীয়রা তাদের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনেছেন।
ভোরের ঝুঁকি এড়াতে কাছের স্কুলে পাঠদান আধা ঘণ্টা দেরিতে শুরু হয়। শেষকৃত্য ও বিয়ের অনুষ্ঠানও সান্ধ্যকালীন ঝুঁকি এড়াতে তাড়াতাড়ি শেষ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে হাতির গতিবিধির আপডেট রাখেন এবং প্রয়োজনে সংঘবদ্ধ হয়ে পটকা ফুটিয়ে হাতি তাড়ানোর ব্যবস্থা করেন।
বনাঞ্চল উজাড় বন্ধ করা এবং পুনঃবনায়নের মাধ্যমে হাতির প্রাকৃতিক আবাসস্থল ফিরিয়ে দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। নিজেরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও বান্দারা মনে করেন, মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলেই এই বন্যপ্রাণীগুলো লোকালয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে পশুর প্রতি কোনো ঘৃণা না রেখে বরং বন রক্ষা করা ও সহাবস্থানের পথ খোঁজাই এই সংকট নিরসনের একমাত্র ্উপায় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।