গর্ভাবস্থায় কেন ভুলে যান অনেক কিছু, কারণ খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা

গর্ভাবস্থায় কেন ভুলে যান অনেক কিছু, কারণ খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা

অনলাইন ডেস্ক
গর্ভাবস্থায় অনেক নারীই হঠাৎ ছোটখাটো বিষয় ভুলে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বলেন। কখনো ঘরে ঢুকে কেন এসেছেন তা মনে থাকে না, কখনো কোথায় চাবি রেখেছেন তা খুঁজে পাওয়া যায় না।পরিচিত কোনো নাম বা শব্দ মনে করতে সময় লাগে, আবার কখনো কথার মাঝখানেও হারিয়ে যায় চিন্তার সূত্র। এই অভিজ্ঞতাকে অনেকে ‘প্রেগন্যান্সি ব্রেন’ বা ‘মমি ব্রেন’ বলে থাকেন।

 

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদন এ তথ্য দেয়।

এবার নতুন এক গবেষণায় গর্ভাবস্থায় এমন ভুলে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

গবেষণাটি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বেইলর কলেজ অব মেডিসিন ও লুইজিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে সায়েন্স বুলেটিন-এ।গর্ভাবস্থায় শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এই হরমোন ভ্রূণের বিকাশ, মায়ের শরীরের বিভিন্ন পরিবর্তন এবং প্রসবের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গবেষকেরা পরীক্ষাগারে ইঁদুরের ওপর এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন, যাতে তাদের শরীরে দীর্ঘ সময় ধরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশি থাকে। এতে ইঁদুরগুলোর সাময়িক স্মৃতির সমস্যা দেখা দেয়। তবে তাদের মেজাজ বা আচরণে একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি।আরও বিশ্লেষণে বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট স্নায়ুপথের পরিবর্তন শনাক্ত করেন। এর একটি হলো হাইপোথ্যালামাস, যা শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। অন্যটি হিপোক্যাম্পাস, যা স্মৃতি তৈরি ও সংরক্ষণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

গবেষণায় দেখা যায়, ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশি থাকলে হাইপোথ্যালামাসের কিছু নিউরনের কার্যক্রম বেড়ে যায়। এর ফলে হিপোক্যাম্পাসের কার্যক্রম কিছুটা দমে যায় এবং স্মৃতির ওপর প্রভাব পড়ে।

বুদ্ধি কমে যায়—এমন নয়

গবেষকেরা বিশেষভাবে বলেছেন, গর্ভাবস্থায় কিছু বিষয় ভুলে যাওয়া মানেই সামগ্রিকভাবে বুদ্ধি বা চিন্তাশক্তি কমে যাওয়া নয়।

গবেষণার অন্যতম নেতা ড. ইয়ানলিন হে বলেন, গর্ভাবস্থা কাউকে ‘কম বুদ্ধিমান’ করে দেয়—বিষয়টি এমন নয়। বরং নির্দিষ্ট কিছু স্মৃতিসংশ্লিষ্ট কাজে সূক্ষ্ম ও সাময়িক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

এই সমস্যা গর্ভাবস্থার শেষ দিকে বেশি স্পষ্ট হতে পারে এবং সন্তান জন্মের পরও কিছু সময় থাকতে পারে। তবে সাধারণত সন্তান জন্মের পর ধীরে ধীরে তা কমে যায়।

স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি—দুই ক্ষেত্রেই কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। পরিচিত তথ্য মনে করতে সমস্যা হওয়া, নাম বা শব্দ মনে করতে দেরি হওয়া কিংবা কোনো কাজের কথা ভুলে যাওয়া এর মধ্যে পড়তে পারে।

গবেষক ড. ঝেং সান বলেন, এই ধরনের পরিবর্তন সাধারণত গুরুতর বা চিকিৎসাগতভাবে অক্ষম করে দেওয়ার মতো নয়। তবে দৈনন্দিন কাজ ও আত্মবিশ্বাসে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।

৭০ নারীর ওপরও পরীক্ষা

শুধু ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করেই থেমে থাকেননি গবেষকেরা। তারা ৭০ নারীর স্মৃতিশক্তিও পরীক্ষা করেন। তাদের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের গর্ভবতী নারী এবং গর্ভবতী নন এমন নারীও ছিলেন।

দীর্ঘমেয়াদি, স্বল্পমেয়াদি ও কাজের সময় প্রয়োজনীয় স্মৃতি বা ওয়ার্কিং মেমোরি যাচাই করা হয়। এতে দেখা যায়, গর্ভাবস্থার শেষ দিকে কিছু স্মৃতিসংশ্লিষ্ট কাজে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। একই সময়ে রক্তে ইস্ট্রোজেনের মাত্রাও বেশি ছিল।

গবেষকেরা আরও দেখতে পান, রক্তে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা যত বেশি ছিল, কয়েকটি স্মৃতিসংশ্লিষ্ট পরীক্ষায় ফলাফল তত খারাপ হওয়ার প্রবণতা ছিল। অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক দেখা গেছে।

তবে এখানেই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা সরাসরি ওই নির্দিষ্ট স্নায়ুপথে হস্তক্ষেপ বা সেটির কার্যক্রম পরিমাপ করেননি। তাই মানুষের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন ও স্মৃতির পরিবর্তনের সম্পর্কটি গবেষণার ফলকে সমর্থন করলেও, ইঁদুরের পরীক্ষার মতো সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক প্রমাণ করে না।

গবেষকদের মতে, এই গবেষণা গর্ভাবস্থায় দেখা দেওয়া ভুলে যাওয়ার প্রবণতাকে আরও ভালোভাবে বোঝার একটি সম্ভাব্য পথ দেখিয়েছে। অর্থাৎ গর্ভাবস্থায় হঠাৎ কিছু ভুলে যাওয়া সবসময় অসাবধানতা বা মনোযোগের অভাবের কারণে নয়। শরীরের হরমোনগত পরিবর্তনের সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

inside-post
আরো দেখুন