লোকাল ট্রেনের গায়ক থেকে বলিউড প্লেব্যাক: দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুনীল লোধীর অনুপ্রেরণার গল্প

লোকাল ট্রেনের গায়ক থেকে বলিউড প্লেব্যাক: দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুনীল লোধীর অনুপ্রেরণার গল্প

 বিনোদন ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬,

মধ্যপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণ সুনীল লোধী একসময় লোকাল ট্রেনের কামরা ও গ্রামের ধর্মীয় আসরে একতারা হাতে ভজন গাইতেন। আজ সেই কণ্ঠই পৌঁছে গেছে বলিউডে। সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হনুমান অংশ’ চলচ্চিত্রে তার গাওয়া ‘ম্যায়নে তেরে হি ভরোসে’ গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে তাকে ভারতের আলোচিত নতুন প্লেব্যাক শিল্পীদের একজন করে তুলেছে।

inside-post
মাত্র ২৫ বছর বয়সী সুনীলের এই সাফল্যের গল্প কেবল সংগীতজীবনের অর্জন নয়; এটি প্রতিকূলতাকে জয় করা এক শিল্পীর অদম্য সাধনারও গল্প।

বুন্দেলখণ্ডের মাটিতে বেড়ে ওঠা

সুনীল লোধীর জন্ম মধ্যপ্রদেশের ঐতিহাসিক বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে। জন্ম থেকেই তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তবে দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা কখনোই তাকে সংগীতচর্চা থেকে দূরে সরাতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই একতারা হাতে ভজন ও বুন্দেলি লোকসংগীত গেয়ে গ্রামের মানুষ ও ট্রেনের যাত্রীদের মন জয় করতেন তিনি।

ধর্মীয় অনুষ্ঠান, গ্রামীণ আসর কিংবা লোকাল ট্রেন—যেখানেই সুযোগ মিলেছে, সেখানেই গান গেয়েছেন সুনীল। তার কণ্ঠের সরলতা ও ভক্তিময় আবেগই ধীরে ধীরে তাকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।

লতা মঙ্গেশকর ছিলেন মানসগুরু

প্রথাগত কোনো সংগীতবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেননি সুনীল। দূরদর্শনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, রেডিও ও টেপ রেকর্ডারে লতা মঙ্গেশকরের গান শুনেই নিজের মতো করে সংগীত শিখেছেন। কিংবদন্তি এই শিল্পীকেই তিনি মনে মনে নিজের গুরু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

১০–১১ বছর বয়স থেকেই শুরু হয় তার সংগীতসাধনা। আধুনিক বাদ্যযন্ত্র নয়, একতারাই ছিল তার একমাত্র সঙ্গী।

সোশ্যাল মিডিয়ায় বদলে যায় ভাগ্য

দীর্ঘদিন স্থানীয়ভাবে গান গাইলেও বৃহত্তর পরিচিতি আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে। বুন্দেলখণ্ডের আঞ্চলিক সংস্কৃতিভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘বুন্দেলি দুনিয়া’ তার গান রেকর্ড করে প্রকাশ করে।

প্রথমে কয়েকটি লোকগান জনপ্রিয় হলেও প্রকৃত আলোচনায় আসে হনুমান ভজন ‘মোর সংকট কে কাটাইয়া’। গানটি প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখের বেশি ভিউ পেয়ে সুনীলকে রাতারাতি কোটি মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলে।

ভাইরাল গান থেকে বলিউডে ডাক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভজনটি নজরে আসে মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সংগীত প্রযোজক পঙ্কজ ভিআরকের। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তিনি সুনীলের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুম্বাইয়ে আমন্ত্রণ জানান।

সাই বাবা স্টুডিওতে পঙ্কজের প্রযোজনায় আটটি গান রেকর্ড করেন সুনীল। এর মধ্যে ছিল ‘ম্যায়নে তেরে হি ভরোসে’। মজার বিষয়, গানটি রেকর্ড করার সময় তিনি জানতেনই না যে এটি একটি মূলধারার হিন্দি চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হবে।

‘হনুমান অংশ’-এর কণ্ঠে জাতীয় পরিচিতি

পরিচালক বিশাল চতুর্বেদী নির্মিত ‘হনুমান অংশ’ চলচ্চিত্রটি নিম করোড়ি বাবার আধ্যাত্মিক জীবন ও দর্শনকে কেন্দ্র করে নির্মিত। ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট মুক্তির পর ছবির সবচেয়ে আলোচিত দিক হয়ে ওঠে সুনীলের গাওয়া গানটি।

ভক্তিমূলক কথামালা, আবেগঘন সুর এবং সুনীলের আন্তরিক কণ্ঠ দেশ-বিদেশের অসংখ্য শ্রোতার হৃদয় স্পর্শ করে। এর মধ্য দিয়ে লোকাল ট্রেনের সেই অখ্যাত গায়ক বলিউডের প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে নতুন পরিচয় পান।

মুখ্যমন্ত্রীর সংবর্ধনা ও সম্মাননা

সুনীলের সাফল্যে তাকে সংবর্ধনা দিয়েছে মধ্যপ্রদেশ সরকার। ভোপালে মুখ্যমন্ত্রী ড. মোহন যাদবের বাসভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাকে এবং তার বাবা-মাকে সম্মাননা জানানো হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে তাকে এক লাখ রুপি আর্থিক সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যয় বহনের আশ্বাসও দিয়েছে রাজ্য সরকার।

সংগ্রাম থেকে অনুপ্রেরণা

সুনীল লোধীর গল্প প্রমাণ করে, বড় মঞ্চ বা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগই সাফল্যের একমাত্র পথ নয়। লোকাল ট্রেনের কোলাহল থেকে শুরু হওয়া এক তরুণের একনিষ্ঠ সাধনা ও বিশ্বাস তাকে পৌঁছে দিয়েছে দেশের অন্যতম বড় সংগীতমঞ্চে। তার এই যাত্রা আজ অসংখ্য সংগ্রামী শিল্পীর জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম।

আরো দেখুন